বাংলাদেশে গণরাজনৈতিক ধারা বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্যের অভিমুখ নির্দেশ করাই এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। এই বইটি সম্প্রতি আমার প্রয়াত ভাই বিপ্লবী সিরাজুল আলম খানকে উৎসর্গ করেছি। সত্যি বলতে কি ‘জনগণ’ কথাটির বুদ্ধিবৃত্তিক তাৎপর্য বোঝার আগে তার ব্যবহারিক শক্তির মর্ম আমি সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক চর্চা থেকেই শিখেছি।
বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের দুই মহানায়ক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সিরাজুল আলম খান। দুজনের রাজনীতি বাহ্যিক দিক থেকে আলাদা হলেও দুই জনই বিশ্বাস করতেন জনগণের অভিপ্রায়ের চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে গণঅভ্যুত্থান এবং বিজয়ী গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত জনগণের গাঠনিক শক্তির (Constituent Power) অধিষ্ঠানই গণতন্ত্র। নির্বাচন নয়। গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং রাষ্ট্র গঠনে ব্যর্থ হলে ক্ষমতা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রূপ নিয়ে জনগণের টুঁটির ওপর বাঘের থাবার মতো চেপে বসে এবং নির্বাচন ফ্যাসিস্ট শক্তি বৈধ করবার হাতিয়ার হিশাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে নির্বাচনবাদ ফ্যাসিস্ট শক্তির মতাদর্শ। বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের যথেষ্ট সেই শিক্ষা দিয়েছে।
এই গ্রন্থটির পেছনে আমার নিজের ক্ষতবিক্ষত হৃদপিণ্ডের অনেক টুকরা জড়িত। বইটি হাতে যখন স্নেহ ভাজন সারোয়ার তুষার তুলে দিলেন, ভেবেছি, একাত্তরে শহিদদের প্রতি কিছু দায় কি শোধ করা গেল? আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে বাহাত্তরে আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে ‘গঠন’ করতে পারি নি, সেই কাজ আমাদের অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে সেটা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য এই গ্রন্থ। এই ক্ষেত্রে মোহাম্মদ রোমেলের কৃতিত্ব স্বীকার না করে উপায় নাই। গণরাজনীতির নানান ব্যর্থতা ও হতাশা আমাদের কখনই কাবু করতে পারে নি। রোমেল আমার সঙ্গে সবসময়ই একান্ত ছিলেন। এই গ্রন্থের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘকাল বিস্তর আলাপ হয়েছে। তাঁকে এবং ভাববৈঠকির সকল সক্রিয় সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। দীর্ঘকাল এই সকল বিষয় নিয়ে আমরা পরস্পর কথা বলেছি। আরও বলব। চিন্তা পাঠচক্রের সদস্যদেরও আমি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে আমাদের নিজেদের ‘গঠন’ করতে বা ‘গঠিত’ হতে দেওয়া হয় নি, — এই রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি এবং তার মীমাংসার জন্য ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘বিজয়ী গণঅভ্যুত্থান’ এবং নিজেদের নতুন ভাবে ‘গঠন’ করবার রাজনীতির কথা এই গ্রন্থে জোরেসোরে বলা হয়েছে। গণমানুষের মুক্তির একমাত্র পথ আন্দোলন-সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী এবং তীব্র করা। পুরাতন ও নব্য মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণীর বাজারি প্রতিযোগিতা বা ‘নির্বাচন নির্বাচন’ খেলা আমাদের কোত্থাও নেবে না। মাফিয়া, লুটেরা ও কালোটাকার মালিক ছাড়া বর্তমান লুটতরাজের বাজার ও বর্তমান নির্বাচন পদ্ধিততে জনগণ কখনই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারবে না।
আগে চাই গণতন্ত্র কায়েম, তারপর নির্বাচন।
বিভ্রান্ত ও প্রতারণামূলক নির্বাচনবাদী মাফিয়া ও লুটেরা রাজনীতি থেকে দ্রুত মুক্ত হয়ে সবার আগে দরকার জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা আদায় করে নেওয়ার নীতি ও কৌশলের প্রতি মনযোগী হওয়া। মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা। শুধু ভোটের অধিকার নয়, আমাদের দরকার আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সকল মানবাধিকারের বাস্তবায়ন। কিন্তু লুটেরা ও মাফিয়া গোষ্ঠি শুধু ভোটের অধিকারের কথা বলে, অন্যসকল মানবাধিকারের কথা বলে না।
অতএব দরকার বিজয়ী গণঅভ্যুত্থান, নতুন গঠনতন্ত্র এবং নতুন গণরাষ্ট্র।
সারোয়ার তুষারের তাড়া এবং আন্তরিক উৎসাহ আমি চিরকাল মনে রাখব। তরুণ ভাবুকদের কাছে তাকে তাড়া খাওয়া প্রভূত আনন্দের, আমার জন্য বাড়তি পাওনা। রাষ্ট্রচিন্তা গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে, তাদের অশেষ ধন্যবাদ। বন্ধু হাবিবুর রহমানের আগ্রহ, মতামত আমাকে বিপুল উৎসাহিত করেছে। বুঝেছি যাদের সঙ্গে একদা পথ চলেছি, তাঁরা কেউই দূরে নন। দূরে ছিলেন না। একটা বিশাল কালপর্ব আমাদের পার হয়ে আসতে হয়েছে। ফলে দায় বেড়েছে। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশে শক্তিশালী গণরাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গীকার ও দায়বোধ আগের চেয়ে অনেক সতর্ক , শাণিত ও সজ্ঞান। আশা করি আমরা সকলে মিলে বাংলাদেশে শক্তিশালী গণরাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
Reviews
Clear filtersThere are no reviews yet.